Thursday, June 9, 2016

খাবারের ফেরিওয়ালা

খাবারের ফেরিওয়ালা দুই ভাই সজল ও জসীম (ডানে)। আদালত চত্বরে খাবারের বক্স হাতে দেখা মিলল তাঁদের। ছবি: আসাদুজ্জামানজসীম ও সজল। আপন দুই ভাই। একজনের বয়স ২৯ বছর। আরেকজনের ২১। তাঁদের আরেক পরিচয় তাঁরা ‘খাবারের ফেরিওয়ালা’।


রোজ ঢাকার আদালতে বক্সে করে খাবার সরবরাহ করেন ওই দুই ভাই। খাবারের দাম ৫০ টাকা। খাবার খান আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইনজীবীরা।
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ঘুম থেকে উঠে পড়েন তাঁরা। এরপর মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে যান। তাঁদের মা জামিলা বেগম শুরু করেন রান্না। শেষ হয় সকাল আটটা থেকে নয়টায়। পরে দুই ভাই মিলে খাবার বক্সে তোলেন। এরপর সেই বক্সগুলো নিয়ে দুপুরের আগেই চলে আসেন ঢাকার আদালত চত্বরে। পরে একে একে খাবারের বক্স পৌঁছে দেন গ্রাহকের টেবিলে টেবিলে।
তবে আজ মঙ্গলবার থেকে দুই ভাইয়ের ছুটি। তাঁরা আসেননি আদালতে। রমজান শুরু হওয়ায় দুপুরে খাবার বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। জানতে চাইলে জসীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ মঙ্গলবার থেকে আমাদের ছুটি শুরু। এক মাস আমরা বেকার থাকব। রোজার পর আবার নিয়মিতভাবে খাবার দেওয়া শুরু করব। ছয় বছর ধরে এই কাজ করেই সংসার চালাই। আর কোনো কাজ শিখিনি।’
জসীমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে ছয় বছর আগে খাবার বিক্রি শুরু করেন। ১০টি খাবারের বক্স দিয়ে তাঁর ব্যবসা শুরু। প্রতিটির দাম নেন ৫০ টাকা। খাবারের তালিকায় ভাতের সঙ্গে কোনো দিন থাকে ডিম, ভাজি ও ডাল। আবার কোনো দিন থাকে মাংস ও মাছ। খাবারের মান ভালো হওয়ায় তাঁর খাবারের চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকে। ব্যবসা শুরুর দিকে ১০ থেকে ১৫ জনকে খাবার দিতেন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক শতে।
ঢাকার ৩ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের পেশকার আরিফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, জসীমের খাবারের মান খুব ভালো। দাম কম। মাত্র ৫০ টাকা। তাই কয়েক বছর ধরে তিনি জসীমের দেওয়া খাবার খান। আদালতের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীই তাঁর খাবার খেয়ে থাকেন।
জসীমের বাড়ি থেকে আনা এই খাবারের বক্স গুলোই একে একে পৌঁছে যায় আদালতের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও আইনজীবীদের কাছে। ছবি: আসাদুজ্জামানজসীমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সংসারে আছে তাঁর মা, বাবা, স্ত্রী ও এক ভাই। ডেমরার ভাড়া বাসায় থাকেন সবাই মিলে। খাবারের ব্যবসা শুরু করার সময় সজল পড়াশোনা করতেন। তখন তিনি একাই খাবার দিতেন। সজলকে এসএসসি পাস করিয়েছেন। পরে লেখাপড়া না করায় তাঁকে ব্যবসার কাজে লাগিয়েছেন।
সজল বলেন, অভাবের সংসার। তাই আর পড়াশোনা করিনি। বড় ভাই খাবার বিক্রি করে সংসার চালান। তিন বছর আগে ভাইয়ের সঙ্গে কাজ শুরু করেন।
মানিকগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা জসীমের বৃদ্ধ বাবা আবদুল আউয়াল বয়স বেশি হওয়ায় এখন আর কোনো কাজ করতে পারেন না। মা জামিলা খাতুন সবদিক দেখেন। ৫০ বছর বয়সী জামিলা খাতুন প্রতি শনিবার যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচাবাজার করেন। মাছ-মাংস কেনেন জসীম।
‘আগের চেয়ে মাছ, মাংস, তরিতরকারির দাম বেড়ে গেছে অনেক গুণ। তারপরও মাত্র ৫০ টাকায় খাবার বিক্রি করতে হয়। তাই লাভ আর বেশি থাকে না।’ বলেন জসীম।
জসীমের স্বপ্ন খাবারের হোটেল দেওয়া। জসীম বললেন, খাবারের এই ব্যবসা অনেক কষ্টের। ভোর থেকে শুরু হয় কাজ। শেষ হয় রাতে। পুঁজি বেশি হলে তিনি ফেরি করে খাবার বিক্রির ব্যবসা করবেন না। আদালত এলাকায় খাবারের হোটেল দেবেন। এ স্বপ্ন কবে পূরণ হবে, তা তিনি জানেন না। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাবেন তিনি।

No comments:

Post a Comment